৩০শে মার্চ সদরঘাট থেকে লঞ্চে আমরা ঢাকা ছাড়লাম। ভাল করে মনে নেই। মনে হচ্ছে পরদিন সকালের দিকে আমরা চাঁদপুরের মতলব গিয়ে পৌঁছালাম। হাটার পথে রণিকে জয়নাল বা পান্না কোলে নিয়েছে। মতলবের একজন বিখ্যাত মানুষের বাড়িতে আমরা আশ্রয় পেয়েছিলাম। মেজবানের নামটা এখন এই মূহুর্তে মনে পড়ছেনা। খুব খারাপ লাগছে। রাতে আমরা সেই বাড়িতে ছিলাম। সকালে নাশতা করে আবার যাত্রা শুরু করলাম। রিকশা করে চাঁদপুর স্টেশনের দিকে গেলাম।যদি ট্রেন পাওয়া যায়। ভাগ্য ভাল ট্রেন পাওয়া গিয়েছিল। ওই ট্রেনে লাকসাম পৌঁছালাম। ওখানে গিয়ে আবার সবকিছু অনিশ্চিত পড়লো। ট্রেন ছাড়বে কি ছাড়বেনা তা কেউ বলতে পারছেনা। প্রায় সন্ধ্যার দিকে জানা গেল একটা ট্রেন ফেণী পর্যন্ত যাবে। সেই ট্রেনেই আমরা রওয়ানা দিলাম। ৩১ শে মার্চ আমরা ফেণী পৌঁছালাম। সকালে না বিকালে এখন ঠিক মনে নেই। সারা শহরে মানুষের ভিতর আতংক। খাজা সাহেব তখনও ফেণীতে। তারিখ মনে নেই। যতদূর মনে ৩রা এপ্রিল ফেণিতে পাক বাহিনী শেলিং করে। ওর পরেই মানুষ দলে দলে শহর ছাড়তে শুরু করে। আমরা সবাই আলাদা হয়ে গেলাম। চাচীআম্মা ও আমার বোনেরা সবাই পাঠান নগর চলে গেল। আমি শ্বশুর শ্বাশুড়ী ও অন্যান্যদের নিয়ে প্রথমে রামপুর নানার বাড়ী গেলাম। নানার বাড়ি শহরের কাছে হওয়ায় আমরা দক্ষিণে মেজো খালার বাড়ী গেলাম। সেখানে এক রাত কাটাবার পর সকালবেলা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম কে কোথায় যাবো।
আমার শ্বশুর শ্বাশুড়ী ও তাঁদের পরিবারের অন্য সদস্যরা আহমদ পুর চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। আমরা মানে আমি ইসহাক রণি ও আমার স্ত্রী কুঠিরর হাট বিষ্ণুপুর হাই স্কুলে থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম।বিষ্ণুপুর থাকার সময় কিছু যুবককে সাথে নিয়ে আমি নিয়মিত একটি হাতে লেখা বুলেটিন প্রকাশ করতাম।বিবিসি শুনে আমরা আমরা প্রতিদিন সন্ধ্যায় কার্বণ কপি করে ওই বুলেটিন বিলি করতাম। ওই বুলেটিন আশে পাশের হাট বাজারে বিলি হতো। বেশ কিছুদিন থাকার পর খবর পেলাম ফেণীতে পাক বাহিনী ঢুকে পড়েছে। যেকোন সময়ে কুঠির হাট চলে আসতে পারে। কুঠিরহাট ছেড়ে দিয়ে আমরা আহমদপুর গেলাম। আরও অনেক পরিবার সে বাড়িতে ছিল। থাকার অসুবিধা থাকলেও খাওয়ার অসুবিধা ছিলনা। বেশ ভালই দিন কাটছিলো। হঠাত্ একদিন আমার চাচা শ্বশুর ও স্থানীয় নেতা বেলায়েত সাহেব জানালেন জামাইকে এখানে বেশীদিন রাখা যাবেনা। বাজারে নানা কানাঘুষা হচ্ছে। যেকোন সময় যেকোন কিছু ঘটে যেতে পারে।
সম্ভবত মে মাসের শুরুতে আমাকে আহমদ পুর ছেড়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিতে হলো। আমার সাথী হলো আমার ছোট ভাই সালু। সব কথা এখন আর ভাল করে মনে নেই। যতদূর মনে পড়ছে, মুন্সীবাড়ি থেকে আমরা প্রথমে আমার খালতো বোন নুরজাহানের বাড়িতে গেলাম। নুরজাহানের স্মামী রাজ্জাক সাহেব খুবই ভাল মানুষ ছিলেন। সে বারিতে কিছুক্ষণ কাটিয়ে আমরা আবার রওয়ানা দিলাম। বিকেলের দিকে কাতালিয়া ফকির হাটে গিয়ে পৌঁছালাম। সেখানে গিয়েই মহা বিপদে পড়লাম। আমাদের দূর সম্পর্কের এক আত্মীয় আমাদের কাছে ডেকে নিলেন। আমরা আশা করেছিলাম তিনি আমাদের সহযোগিতা করবেন। ভদ্রলোক পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করছিলেন। এক ধরণের গোঁড়া মানুষ। কিছু না বুঝেই, বিনা স্বার্থেই ওই কাজ করছিলেন। তিনি আমাদের ডেকে এক চা দোকানে নিয়ে গেলেন। সেখানে আমাদের পরিচিত আরও অনেক লোক ছিলো। ওই লম্বা কোর্তা পরা ভদ্রলোক আমাদের ভারতের দালাল ও পাকিস্তানের শত্রু বলে গালাগাল করছিলেন। অন্যান্য আত্মীয়রা ওই ভদ্রলোককে অনুরোধ করলেন এই বিপদের সময় কোন ঝামেলা না করার জন্যে।
১৯৬৬ সালে বংগবন্ধু শখ মুজিবুর রহমান অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে রক্ষা করার জন্যে ৬ দফা পেশ করেন। ৬ দফা মুলত ছিল পাকিস্তানকে একটি কনফেডারেটিং রাস্ট্রে পরিণত করার প্রস্তাব ছিল। সেই ৬ দফা নিয়েই জেনারেল ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনা করেছেন ৭১ সালের ২৪শে মার্চ পর্যন্ত। বাংগালী পুঁজিপতি ও বাংগালী আমলারা ৬ দফা প্রস্তাব তৈরী করেছিলেন। একথা সত্যি যে পাকিস্তানের সর্বযক্ষেত্রে বাংগালীরা পিছিয়ে পড়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানীরা বিষয়টি বুঝতে চেস্টা করেনি। অথবা এ ব্যাপারে আদৌ তাদের আগ্রহ ছিলনা। ৬ দফার কারণেই আওয়ামী লীগ ৭০ সালের নির্বাচনে বাংগালীদের একক দলে পরিণত হয়। ওই নির্বাচনে জামাত ছাড়া অন্যান্য দল আংশ গ্রহণ করেনি। মাওলানা ভাসানী নির্বাচন বয়কটের ডাক দিয়েছিলেন। মাওলানা সাহেবের ন্যাপ নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করলে কম পক্ষে ২০ টা সিট পেতেন।
পাকিস্তানের সামরিক সরকার যদি ২৫শে মার্চ রাতে পূর্ব পাকিস্তানের উপর আক্রমন না চালাতো তাহলে আজ ইতিহাস অন্যভাবে লিখা হতো। জেনারেল ইয়াহিয়া ছিলেন পাকিস্তানের সবচে বড় মাতাল সামরিক শাসক। তাকে উসকে দিয়েছে জুলফিকার আলী ভুট্টো। ১৯৭০ সালের সাধারন নির্বাচন অনুযায়ী জুলফি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা। আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিব ছিলেন সারা পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা। সে হিসাবে পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রী হওয়ার কথা শেখ সাহেবের। ইয়াহিয়া শেখ সাহেবকে প্রধান মন্ত্রী হিসাবে সম্বোধনও করেছিলেন। কিন্তু বাধ সাধলেন জুলফি। তিনি বললেন একদেশ দুই প্রধান মন্ত্রী। জুলফির এই বক্তব্যের মাধ্যমেই পাকিস্তান ভেংগে যাওয়ার ইংগিত পাওয়া গেছে। ভুট্টো কি চায় তাও স্পস্ট হয়ে গেলো। ইয়াহিয়া ঢাকায় আসলেন বংগবন্ধু শেখ মুজিবের সাথে আলাপ করার জন্যে। ইয়াহিয়া যখন ঢাকায় আসেন তখন সারা পূর্ব পাকিস্তানে আগুন জ্বলছে। ১লা মার্চ থেকেই শখ সাহেবের ডাকে পূর্ব পাকিস্তানে অসহযোগ আন্দোলন চলছিল। শেখ সাহেব প্রতিদিন নতুন নতুন ফরমান জারী করছিলেন। সেই ভাবেই পূর্ব পাকিস্তানের সরকার চলছিল। ৭ই মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের লাখো মানুসের জনসভায় ঘোষনা দিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। ২০শে মার্চ থেকে শেখ সাহেবের সাথে ইয়াহিয়ার যে আলোচনা শুরু হয়েছিল তার ফলাফল কি তা দেশবাসী কখনই জানতে পারেনি। শেখ সাহেব নিজেও তা কখনও দেশবাসিকে জানানো প্রয়োজন মনে করেননি। ২৫শে মার্চের সামরিক অভিযানের আগেই শেখ সাহেব পাকিস্তানী সামরিক জান্তার কাছে ধরা দেন। কাউকে কিছু না জানিয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা ভারতে চলে গেলেন।পাকিস্তানীদের মহাভুল ছিল তারা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মনোভাব বা সেন্টিমেন্ট বুঝতে পারেনি। ফলে সামরিক অভিযানকে এই অঞ্চলের মানুষ একেবারেই সমর্থন করেনি। সামরিক অভিযানের পর ভারতের ভূমিকা কি হতে পারে সামরিক জান্তা মোটেই আঁচ করতে পারেনি। প্রায় কোটি লোক ভারতে চলে গিয়েছিল। ভারতের বিশ্বব্যাপী প্রচারের ফলে বিশ্ব জনমত ভারতের পক্ষে চলে গিয়েছিল। ১৬ই ডিসেম্বরের পর ইন্দিরা গান্ধী ভারতীয় পার্লামেন্টে বলেছিলেন,হাজার সালকা বদলা লিয়া। যারা ইতিহাস পড়েন বা এই উপমহাদেশর ইতিহাস জানেন তারা ইন্দিরা গান্ধীর ভাষনের সারমর্ম বুঝতে পেরেছেন। ওই ঐতিহাসিক ভাষনের মাধ্যমে মুসলমানদের ব্যাপারে ভারতের পররাস্ট্র নীতিরও প্রকাশ ঘটেছে। ভারতে মুসলমানদের প্রথম বিজয় ঘটেছে ৭১১ সালে মুহম্মদ বিন কাসেমের মাধ্যমে।
পরে হাজার সালের দিকে মুসলমানরা দিল্লীর ক্ষমতা লাভ করে। সেই শাসন ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত চলে। ১৮৫৮ সালে ইংরেজরা দিল্লীর ক্ষমতা দখল করে। এই দখলদারী ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত চলে। চতুর ধুর্ত ও শিয়াল প্রকৃতির ইংরেজরা ভারতীয় কংগ্রেসের সহযোগিতায় ভারতকে বিভক্ত করে দুটি দেশ গথণ করে। একটি মুসলমানদের জন্যে ও অপরটি হিন্দুদের জন্যে। মুসলমানদের দেশ পাকিস্তান ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে দু টুকরা হয়ে যায়। পূর্ব পাকিস্তান শ্বাধীন বাংলাদেশে রূপান্তর হয়। এক হাজার বছরের ইতিহাসে এই প্রথম একজন মুসলমান সেনাপতি হিন্দু সেনাপতির কাছে আত্মসমর্পন করে। ওই কারণেই ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন ‘হাজার সাল কা বদলা লিয়া’।
২।
এখন আবার ভারতের শাসকরা অখন্ড ভারতের স্বপ্ন দেখছেন। তারা স্বপ্ন দেখছেন আফগানিস্তান থেকে কম্পুচিয়া পর্যন্ত প্রাচীন ভারতবর্ষ প্রতিস্ঠা করা যায় কিনা। এই উদ্দেশ্য ও আদর্শ নিয়ে ভারত পাকিস্তান ও বাংলাদেশের কিছু বুদ্ধিজীবী কাজ করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশে মিডিয়ার ৮০ ভাগই ভারতের স্বার্থে কাজ করে। গুজব রয়েছে ভারত বাংলাদেশের মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক জগতে মাসে ১০০ কোটি টাকা খরচ করে। বেশীর ভাগ বুদ্ধিজীবী নিজেদের বাংলাদেশী মনে করেনা। ওদিকে ভারত শ্লোগান দিচ্ছে বিশ্ব বাংগালী এক হও। আবার সাবেক স্বাধীন সার্বভৌম বংগদেশ গঠণেও ভারতের আপত্তি আছে।