Archive for the 'Articles' Category

১৮ নম্বর তোপখানা রোড

ershadmz May 19th, 2009

 

জাতীয় প্রেসক্লাবের কোন ইতিহাস এখনও তৈরী হয়নি। তবে তৈরি হবার কথা উঠেছে। আশা করা যায় খুব তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে যাবে। ১৮ আমিতো ব্যক্তি উদ্যোগেকিছু করার জন্যে এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছি। সত্যি কথা বলতে কি আমি এ বিষয়ে কিছু কাজও করেছি।১৮ নম্বর হচ্ছে প্রেসক্লাবের হোল্ডিং নম্বর। সিটি কর্পোরেশনের খাতায় ১৮ নম্বর বলেই পরিচিত। জাতীয় প্রেসক্লাবের পরিচিতি এত বেশী যে, নম্বর দিয়ে এই বাড়ীটা চিনতে হয়না। শুধু প্রেসক্লাব বললেই যথেস্ট।প্রতিস্ঠালগ্নে এই ক্লাবের নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান প্রেস ক্লাব। বাংলাদেশ হওয়ার পর নাম পরিবর্তন করে জাতীয় প্রেস ক্লাব করা হয়। ১৯৫৪ সালে প্রতিস্ঠালগ্নের প্রথম কমিটিতে যাঁরা ছিলেন তাঁরা ছিলেন, জনাব এম এ আজিম-সভাপতি, সৈয়দ নুরুদ্দিন-সহসভাপতি, জনাব আবদুল মতিন- সম্পাদক, জনাব হাসানুজ্জামান খান- যুগ্ম সম্পাদক, জনাব মোহাম্মদ মোদাব্বের-কোষাধ্যক্ষ, জনাব এস জি এম বদরুদ্দিন-সদস্য, জনাব একেএম আবদুল কাদির-সদস্য, জনাব সালাহউদ্দিন মোহাম্মদ-সদস্য, জনাব এমআর আখতার-সদস্য, জনাব এসএস আখতার-সদস্য, জনাব আরশাদ হোসেন-সদস্য।প্রতিস্ঠালগ্নে ক্লাবের আদর্শ ছিল:ক) সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক রুচির উন্নয়ন চর্চা এবং তাঁদের সাহিত্য ও শিল্প প্রতিভার বিকাশ ও উন্নয়নে সাহায্য করা।খ) সুস্থ সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের উন্নয়ন ও ঐতিহ্য গড়ে তোলাগ) সাংবাদিকদের নিজস্ব রচনা প্রকাশের সুবিধা করে দেয়া এবং তা বিক্রয় ও বন্টনে সহায়তা করাঘ) উল্লিখিত লক্ষ্য অর্জনে উত্সাহিত করতে সাংবাদিকদের বৃত্তি দেয়া ও পুরস্কৃত করা।আমাদের সিনিয়র অগ্রজ শ্রদ্ধেয় খায়রুল কবির লিখেছেন, ‘১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হওয়ার পর মাত্র কয়েকজন বাংগালী মুসলমান সাংবাদিকতায় এসেছিলেন।তা ছাড়া তেমন সুযোগও ছিলনা।ঢাকায় তখন কয়েকজন বিদেশী সাংবাদিক পোস্টিং নিয়ে এসেছিলেন।তন্মধ্যে এসোসিয়েটেড প্রেসের মিঃ বালানের নাম মনে আছে। বিলেতের ডেইলী মিররের প্রতিনিধির নাম মনে নেই। চায়ের আড্ডাতে প্রায়ই প্রেস ক্লাব প্রতিস্ঠা নিয়ে কথা হতো। ১৯৪৮ সালের দিকে কিভাবে প্রেস ক্লাব প্রতিস্ঠা করা যায় তা নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম। মিঃ বালান আমি ও সৈয়দ নুরুদ্দিনের ভিতর এ আলোচনা সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৫০ সালের দিকে এ আলোচনায় আরও সাংবাদিক যোগ দেন। তাঁরা হলেনতথ্য বিভাগের মোহাম্মদ হোসেন, অবজারভারের আবদুস সালাম।খায়রুল কবির সাহেব লিখেছেন, তখন তিনি টিকাটুলির নাহা ম্যানসনে থাকতেন। কবির সাহেবের বাসায় আড্ডায় প্রেস ক্লাব প্রতিস্ঠার বিষয়টা ধীরে ধীরে পরিস্কার হতে লাগলো। আড্ডায় পরবর্তীতে আরও যাঁরা যোগ দিতেন তাঁরা হলেন জনাব জহুর হোসেন চৌধুরী, এম এ ওহাব ও এম এ আজিম।১৯৫২ সালে ঢাকার কার্জন হলে সাংবাদিকদের এক সম্মেলন অনুস্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে প্রেস ক্লাব প্রতিস্ঠার প্রস্তাব উত্থাপিত হলেও সবাই একবাক্যে সমর্থন জানায়নি। দৈনিক আজাদ ও তত্কালীন চীফ সেক্রেটারী জনাব আজিজ আহমদ প্রস্তাবটি সমর্থন করেনি।১৯৫৪ সালে পূর্বপাকিস্তানে ৯২ক ধারা জারী করা হয়। এটা ছিল প্রায় সামরিক শাসনের মতো। ওই অগণতান্ত্রিক সরকারের আমলেই প্রেস ক্লাবের জন্য বাড়ী বরাদ্দ করা হয়। এ সময়ে প্রদেশের চীফ সেক্রেটারী ছিলেন জনাব এন এম খান। বাড়ি পেলেও আসবাবপত্র এসেছিল উদ্যোক্তাদের বাড়ি থেকে। প্রথম মুলধন এক হাজার টাকাও এসেছিল কয়েকজন উদ্যোক্তার কাছ থেকে। ৫৪ সালে গঠিত প্রথম কমিটির কথা আগেই বলেছি।ক্যান্টিন ছাড়া ক্লাব জীবন পাবেনা মনে করে মিঃ বালান ও স্ত্রী নিজেরাই ক্যান্টিন চালু করেছিলেন নিজেদের চেয়ার টেবিল আর হাড়ি পাতিল দিয়ে।

কিছু স্মৃতি

ershadmz May 16th, 2009

          স্মৃতিকথা কতটুকু সত্য আর কতটুকু মিথ্যা বলা সত্যিই কঠিন।
          তবুও স্মৃতিকথা বলতে খুবই ভাল লাগে। এখন যা বলছি তাকে
          স্মৃতিকথা বলা যাবে কিনা আমার প্রশ্ন আছে।
          ১৯৬১ সালে আমি পাকিস্তান অবজারভারে জয়েন করি। পদবী ছিল
          নবীশ বানিজ্যিক রিপোর্টার। বানিজ্যিক পাতার জন্যে রিপোর্ট করা।
          ওই পাতার দায়িত্বে ছিলেন শিক্ষাবিদ শামসুল হুদা সাহেব। আমি তাঁকে
          স্যার বলে সম্বোধন করতাম। কারণ তিনি পেশাগত ভাবে একজন শিক্ষক
          ছিলেন।এখনও তাঁকে শিক্ষক বলেই মনে করি।
          অবজাভারের নিউজ এডিটর মুসা সাহেব তখন লন্ডনে প্রশিক্ষন লাভ
          লাভ করছিলেন। মাহবুব জামাল জাহেদী সাহেব নিউজ এডিরের দায়িত্ব
          পালন করছিলেন। অবজারের সবাই আমাকে আদর করতো। আমি
          লেখাপড়া কম জানতাম বলে সবার কথা শুনতাম।সবার কাছ থেকে
          শিখার চেস্টা করতাম। অল্প সময়ের মধ্যেই আমি সবার প্রিয় হয়ে
          গেলাম। হুদা সাহেব আমাকে আশাতীত আদর করতেন। তিনি খুব নরম
          মানুষ বলেই তাঁর কাছে কাজ শিখতে পেরেছিলাম।
          তখন চীফ রিপোর্টার ছিলেন শহীদুল হক সাহেব। যিনি পরে বাংলাদেশ
          টাইমসের সম্পাদক হয়েছিলেন। এছাড়াও অনেক ডাকসাইটে রিপোর্টার
          অবজারভারে কাজ করতেন। ওদের সাথে কাজ করতে পেরেছি বলে
          আমি নিজেকে ধন্য মনে করি।
          তখন অবজারভারের সম্পাদক ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ব্যাক্তি
          আবদুস সালাম। মোয়াজ্জেম হোসেন বুলুর জেঠা বলে আমিও তাঁকে জেঠা
          বলে ডাকতাম।অনেক রাত্রে তাঁর বাসায় ছিলামও। তখন বাসা ছিল পুরণো
          নাসির উদ্দিন রোডে। আর অবজারভার অফিস ছিলো খুব কাছেই। জনসন
          রোডে,বাংলাবাজার গার্লস হাই স্কুলের লাগোয়া।
          আমার নবীশী কাটার আগেই দুবার শাস্তি হয়ে গেলো। একবার ক্যামিস্ট্রি
          বানান ভুল লোখার জন্যে,আরেকবার চল্লিশ পয়সার জায়গায় চল্লিশ টাকা
          লিখার জন্যে। প্রথমবার একটাকা যা বেতন থেকে কাটা হয়নি। দ্বিতীয়বার
          পাঁচ টাকা। শেষ জরিমানাটা বেতন থেকে কাটা হয়েছিল। চাকরী প্রায়
          যায় যায়।
          এসময়ে অবজারভারের ম্যানেজিং এডিটর ছিলেন আবদুল গণি হাজারী
          সাহেব। তিনি খুব মিষ্টি মানুষ ছিলেন।তাঁর কারনেই আমার চাকরীটা
          যায়নি। ডাকসাইটে শ্রমিকনেতা মাহবুবুল হক প্রথমে ফেণীতে পল্লীবার্তা
          প্রকাশ করেন।পরে অবজারভার গ্রুপে জয়েন করেন কমার্শিয়াল ম্যানেজার হিসাবে।
          তিনিই আমাকে নবীশ হওয়ার সুযোগ করে
          দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন আমার আপন বড় ভাইয়ের মতো। তাঁর স্নেহ
          মমতা ভালবাসার কথা এ জীবনে ভুলতে পারবোনা। পরবর্তী পর্যায়ে তিনি
          অবজারভার গ্রুপের ম্যানেজিং এডিটর ও দৈনিক পূর্বদেশের সম্পাদক
          হয়েছিলেন। পল্লীবার্তাই পূর্বদেশে রূপান্তরিত হয়।তিনি পাকিস্তান পার্লামেন্টেরও বাঘা মেম্বার ছিলেন।
          ইতোমধ্যে নিউজ এডিটর মুসা সাহেব লন্ডন থেকে ফিরে এলেন।
          জাহেদী সাহেব এডিটোরিয়ালে ফিরে গেলেন। নবীশ সাংবাদিক এরশাদ
          মজুমদারের ত্রাহি অবস্থা। মনে হলো চাকরীটা আর থাকবেনা। বুলু
          বললো এত ভয় পাওয়ার কি আছে? আমি আছি না। অবশ্য এরপরে
          অবজারভারে বেশীদিন চাকরী করিনি।
          এখনকার পত্রিকায় রংচং বেড়েছে, পৃষ্ঠাও বেড়েছে। মান বেড়েছে কিনা
          এ ব্যাপারে আমার ভিন্নমত আছে। পত্রিকাগুলো এখন রাজনীতির মাপকাঠিতে
          পরিচালিত হয়। এখন কাজ জানাটা বড় কথা নয়। কে কোন দল করে
          সেটাই যোগ্যতার প্রধান মাপকাঠি। ৫০/৬০ সালের দিকে এ অবস্থা ছিলনা।
          কাজ জানাটাই ছিল প্রধান মাপকাঠি। বামপন্থী বলে পরিচিত জাহেদী,কে জি মোস্তফা,
          ওয়াহিদুল হক, জাহিদুল হক আরও অনেকে অবজারভারে কাজ
          করতেন। এ ব্যাপারে মালিকের কোন মাথা ব্যথা ছিলনা। সোজা কথা হলো কাজ
          জানো কিনা। এখন দলবাজী করলেই কাজ হবেনা। গ্রুপবাজীও করতে হবে।
          ১৯৬৯ সালের শেষের দিকে আবার অবজারভার গ্রুপে ফিরে আসি।এবার
          সিনিয়র রিপোর্টার হিসাবে পূর্বদেশে কাজ শুরু করি। মাহবুব ভাই তখন
          পূর্বদেশের সম্পাদক। মিয়া ভাই মানে এহতেশাম হায়দার চৌধুরী নিউজ
          এডিটর ছিলেন। বাংলা কগজের ভিতর পূর্বদেশ তখন বহুল প্রচারিত ও
          নামডাকে ভরা। এছাড়া আমি বানিজ্য পাতার দায়িত্বেও ছিলাম। পূর্বদেশে
          কাজ শুরু করার ব্যাপারে একটা কাহিনী আছে বেতন নির্ধারণ নিয়ে। আমার
          কাছে এটা একটা মজার গল্প মনে হয়।
          নিয়োগপত্র ইস্যু করার আগে আমি চুক্তিভিত্তিক কাজ শুরু করলাম। চুক্তিটাও
          ছিল মজার। চুক্তিটা আমি নিজেই ঠিক করেছিলাম। বেতন নির্ধারনের জন্যেই
          এ পথ বেছে নিয়েছিলাম। ঠিক হলো ফার্স্টলিড ৫০ টাকা,সেকেন্ড লিড বা
          তত্সম রিপোর্টের জন্যে ৩০ টাকা, থার্ড লিডের জন্যে ১০ টাকা। সিংগেল
          কলাম হেডিং স্টোরি ফ্রি। বুদ্ধিটা ছিল মিয়া ভাইয়ের।তিনি আমাকে নিতেই চান।
          এভাবে ২/৩ মাস চললো। প্রতি মাসেই আমি
          খুব আরামে ১৩/১৪শ টাকা ড্র করতে শুরু করলাম। এর উপরে ছিল বাণিজ্য
          পাতার জন্যে ২শ টাকা। এসব কান্ডকারখানা দেখে চৌধুরী সাহেবের চোখ
          ছানাবড়া। ব্যাপারটা কি? এ কোন রিপোর্টার যে বিল করে মাসে ১৩/১৪শ
          টাকা নিয়ে যায়। আবার বাণিজ্য পাতার জন্যে ২শ টাকা।
          রিপোর্টারটা কে তাকে একবার দেখা দরকার। তার আগে মাহবুব ভাইয়ের
          ইন্টারভিউ। সরাসরি প্রশ্ন- তুমি কত টাকা বেতন চাও।আগেই বলেছি তিনি
          ছিলেন আমার আপন বড় ভাইয়ের মতো। তাই মনের ভিতর তেমন ডর ভয়
          ছিলনা। বললাম দুটি ইনক্রিমেন্ট সহ সহকারী সম্পাদকের স্কেল দিতে হবে।
          এরপরে চৌধুরী সাহেবের সাথে সাক্ষাতকার। ভয়ে বুক কাঁপছিলো। মাহবুব
          বললেন ভয়ের কিছু নেই। সব ঠিকঠাক আছে।
          নির্ধারিত তারিখে চৌধুরী চেম্বারে গেলাম। সাথে মাহবুব ভাইও ছিলেন।
          কোম্পানীর চেয়ারম্যান ও ডাকসাইটে আইনজীবি হামিদুল হক চৌধুরী
          বাংলায় কথা বললে নোয়াখালীর ভাষায় কথা বলতেন। শুদ্ধ বাংলা বলতেন না
          বা বলতে পারতেন না। প্রথমে প্রশ্ন করলেন, এত বেতন দিয়া কি করবা?
          বিয়েশাদী করছো নাকি? বাড়ী কোথায়? মাহবুব মিয়া বা মুসার আত্মীয়
          হও নাকি?আমি কোন উত্তর দিইনি। চৌধুরী সাহেবও উত্তরের অপেক্ষায়
          ছিলেন না। শেষ প্রশ্ন করেছিলেন এপয়েন্টমেন্ট পেলে এত কাজ করতে
          পারবা নাকি, না সবার মতো ঢিলা দিয়া দিবা। ইন্টারভিউ শেষ, চলে
          আসবো এমন সময় প্রশ্ন করলেন- ক্রেডিট বাজেটিং বোঝ। এবিষয়ে একটা
          রিপোর্টিং কর। পরে বুঝতে পেরেছিলাম কেন তিনি ঐ রিপোর্টটি কেন
          করতে বলেছিলেন।

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা

ershadmz May 16th, 2009

 সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দৃশ্য অদৃশ্য  / এরশাদ মজুমদার

      পাকিস্তান অবজারভারে দেড় বছর আর সংবাদে তিন বছর চাকুরী করার পর আমি গ্রামে
      ফিরে যাই ৬৪ সালের শেষ দিকে।ইচ্ছে ছিলো রাজনীতি করবো।কিন্তূ সে ইচ্ছে পূরণ হয়নি।
      আমার ধারণা দুমুখো খেলা। আমার ধারণা ভুলও হতে পারে। এ ব্যাপারে কোনো তর্কে
      যাবনা। তবুও রাজনীতি দূরে থাকা সম্ভব হয়নি।
      ৬৪ সালের শেষের দিকে একটি সাপ্তাহিক কাগজের জন্যে আবেদন করি। কাগজের নাম
      ফসল। কৃষক আন্দোলনের কাগজ হিসাবে চালাবো বলেই এ নাম দিয়েছিলাম। আমার নামে
      ডিক্লারেশন পাওয়া যাবেনা বলে আমার কাজিন নুরুল ইসলামে আবেদন করেছিলাম।নামের
      শেষে মজুমদার শব্দটি লাগাতে এসবির লোকেরা নিষেধ করেছিলেন। মানে তাদের ইচ্ছে ছিলো
      আমি যেনো ডিক্লরেশন পাই। ৬৫ সালের ১৭ই মার্চ কাগজের ডিক্লারেশন পাই। তখন
      নোয়াখালীর ডিসি ছিলেন আমিনুল হক বা মাহবুবুর রহমান। এরা এখন জীবিত আছেন কিনা
      জানিনা। তখন কাগজের ডিক্লরেশন দিতেন ডিসিরা। নামের ছাড়পত্র দিতো রেজিস্ট্রার অব
      পাবলিকেশন্স। যার অফিস ছিলো ঢাকায়। ছাড়পত্র পেতে কাউকে ঢাকায় আসতে হয়নি।
      এখন নাকি ধর্না নয়, সালামী ও দিতে হয়।
      আমার যতদূর মনে পড়ে তখন ডিসি অফিসের কেরাণী বা পিয়নকে কোনো সালামী দিতে
      হয়নি। এখন নাকি ডিসি অফিসের পিয়নেরও মোবাইল ফোন আছে। অবশ্য জনগনের স্বার্থেই
      পিয়ন সাহেব মোবাইল ফোনটা রেখেছেন। আবেদনপত্র জমা দেয়ার তারিখ থেকে একটি
      পত্রিকার ডিক্লারেশন পেতে দেড় থেকে দু বছর সময় লেগে যায়। অবশ্য তদবির না করলে
      সারা জীবনেও না হতে পারে। অদৃশ্য নানা তদন্তের পর অনেক কাঠখড়ি পুড়িয়ে,সাদামাটা
      ভাষায় অনেক মালপানি ঢেলে অদৃশ্য লোকদের ইতিবাচক রিপোর্ট পাওয়া যায়। এছাড়া
      বড় অংকের টাকা দেখাতে হবে।
      এত ঝামেলা থাকা স্বত্তেও প্রতিদিন নতুন নতুন কাগজের ডিক্লারেশন হচ্ছে। কিন্তু কেনো?ধনীরা
      কাগজ বের করছেন বড় অংকের টাকা খরচ করে সামাজিক প্রভাব বিস্তারের জন্যে। এছাড়া
      রয়েছে ডিউটি-ভ্যাট সহ আরও নানা রকমের রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার সুযোগ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে।
      যেসব কাগজের সার্কুলেশন বেশী তার প্রভাবের কথা ভাবাও যায়না। যেখানে পত্রিকার সার্কুলেশন
      কম,কিন্তু প্রকাশক বা সম্পাদক প্রভাবশালী সেখানেও নানা রকম সুযোগ সুবিধা পাওয়া যায়।
      যেসব কাগজের কোনো ভাবেই প্রভাব নেই,সার্কুলেশন বা সম্পাদক-প্রকাশক খুবই দূর্বল সেখানে
      ফিফটি-ফিফটি প্রথা কাজ করে।
      যদি কেউ সোজা-সাফটা প্রশ্ন করেন সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আছে কিনা, তাহলে অবশ্যই বলতে
      হবে আছে।কিন্তু পর্দার অন্তরালে কি ঘটছে?
      স্বাধীনতার আগে বিজ্ঞাপনের নীতিমালা ছিলো। এখন নেই।মন্রণালয় বলবেন আছে। দেশে বড়
      পত্রিকার সংখ্যা ১৫। সার্কুলেশন ১৫ লাখের বেশী নয়। এসব পত্রিকা সরকারী বিজ্ঞাপনের ৮০
      ভাগ পেয়ে থাকে। সরকারী হিসাব মতে সারাদেশে মোট পত্রিকার সার্কুলেশন ৪৫ লাখ। এর মানে
      হলো রাজধানীর বাইরের কাগজগুলোর সার্কুলেশন ৩০ লাখের মতো। রাজধানীর বাইরের কাগজ
      গুলোর স্থানীয় সার্কুলেশন অনেক বেশী। মনে করুন, কোনো একটি উপজেলায় রাজধানীর বড়
      কাগজের সার্কুলেশন দশ কপি বা বিশ কপি। স্থানীয় সাপ্তাহিক বা দৈনিকের সার্কুলেশন ৫০০ থেকে ৫০০০ কপি।
      এবিসি রিপোর্টে দুর্নীতির সুযোগ থাকায় যেকোনো দৈনিকের সার্কুলেশন ৬০০০ কপিতে উঠে গেছে।
      কারণ ৬০০০ কপি না হলে সরকারী বিজ্ঞাপন পাওয়া যাবেনা। সাপ্তাহিক বা মাসিক কাগজ
      গুলো সরকারী বিজ্ঞাপন পায়না বলে বাধ্য তারা দৈনিকে রুপান্তরিত হয়।
      সরকার যদি আজই নীতি তৈরি করেন যে সাপ্তাহিক ও মাসিক বা যে কোনে কাগজ নিয়ম
      ও নীতি মোতাবেক বিজ্ঞাপন পাবে তাহলে দৈনিকের সংখ্যা কমে যাবে।
      সরকারের সঠিক নীতি থাকলে উচ্চমানের বিশেষ ধরনের মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হবে।যেমন
      কৃষি,বিজ্ঞান,ধর্ম,সাহিত্য,কবিতা প্রকাশিত হবে।
      সরকারী বিজ্ঞাপন পাওয়ার তালিকাভূক্তির জন্যে এখন মাল কোনো কাজই হয়না।সংবাদপত্র
      জগতে বর্তমানে যে দুর্নীতি বিরাজ করছে তার জন্যে সরকারী নীতি দায়ী। এই নীতিই
      দুর্নীতিবাজ সম্পদক-প্রকাশকের জন্ম দিচ্ছে। মাঝখানে বদনাম হচ্ছে সাধারন সাংবাদিকদের।
      সমগ্র সংবাদপত্র জগতের।

    

মফস্বল সাংবাদিকতা

ershadmz May 15th, 2009

               মফস্বল সাংবাদিকতা / এরশাদ মজুমদার
           নিজের অভিজ্ঞতা দিয়েই বিষয়টার উপর আলোকপাত করতে চাই।
           চার বছর ঢাকা-চট্টগ্রামে পাকিস্তান অবজারভার ও সংবাদে কাজ
           করার পর ১৯৬৪ সালের শেষের দিকে ফেণী চলে যাই। তখন আমার
           বাবা ক্যান্সারে আক্রান্ত। ঠিক করলাম ফেণী থেকে যাবো। শুরুতেই ঠিক
           করলাম একটি সাপ্তাহিক কাগজ বের করবো। তখনও আমার বয়স
           পঁচিশ পুরেনি। সাংবাদিকতা করি এটা বাবার ইচ্ছা ছিলনা। তারপর
           মফস্বল সাংবাদিকতা। কমার্সে পড়ালেখা করেছি। বাবার ইচ্ছা ছিল
           চার্টার্ড একাউন্টটেন্ট হই।
           রাজনৈতিক কারণে আমার নামে কাগজের ডিক্লারেশন পাওয়া যাবেনা
           বলে জানলাম। জেলা ও মহকুমা প্রশাসন আমার প্রতি সহানুভুতিশীল
           ছিলেন। আমার এক জ্যাঠাত ভাইয়ের নামে দরখাস্ত করলাম। তিনিই
           কাগজের প্রকাশক ও সম্পাদক। তার নাম নুরুল ইসলাম মজুমদার।
           কিন্তু অনুমতি পাওয়ার স্বার্থে আবেদনপত্রে মজুমদার পদবীটি ব্যবহার
           করনি। ঠিকানাও ঠিক মতো দিইনি। নুরুল ইসলাম সাহেব এখন আর
           জীবিত নেই। পত্রিকা প্রকাশের ব্যাপারে তিনি আমাকে বহু সাহায্য
           সহযোগিতা করেছেন। প্রায়ই মামলা লেগে থাকতো। ফলে তাকে নিয়মিত
           আদালতে হাজিরা দিতে হতো।
           পত্রিকার নাম ছিলো ফসল। মাওলানা ভাসানীর আদর্শে উদবুদ্ধ। মুলতঃ
           কাগজটি ছিল কৃষক আন্দোলনের। লোকে বলতো বামপন্থী কমিউনিস্ট
           আদর্শের কাগজ। ছাত্র বয়সে ছাত্র ইউনিয়ন করতাম। পরবর্তীতে
           মাওলানা সাহেবের ভক্ত ছিলাম। আমি কখনই বামপন্থী বা কমিউনিস্ট
           ছিলামনা। ফসল প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৫ সালের ১৭ই মার্চ।
           তখন এক রীম নিউজপ্রিন্টের দাম ছিল ১০/১২ টাকা।
           ট্যাবলয়েড ৮ পৃষ্ঠার ছাপা খরচ ছিলো ৩০/৪০ টাকার মতো।
           সব মিলিয়ে সপ্তাহে ৭০/৮০ টাকা হলে চলতো। মাসে চারশ’ টাকার
           মতো লাগতো। বিজ্ঞাপনের জন্য মাসে ১৫ দিনের মতো ঢাকা চট্টগ্রামে
           থাকতাম।বাড়ী থেকে চেয়ার টেবিল এনে ট্রান্ক রোডে নিজস্ব একটি
           ভবনের বেসমেন্টে অফিস শুরু করেছিলাম
           এর আগে ঢাকায় অবজাভারে দেড় বছর ও চট্টগ্রামে সংবাদে সাড়ে
           তিন বছর কাজ করে যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল তা ফসল প্রকাশনায়
           কাজে লাগাতে পেরেছিলাম। জেলা ও মহকুমা প্রশাসন কিছুটা সম্মান
           করতো। আমার পরিবারের সবাই এবং বন্ধু বান্ধবরা আমাকে
           সীমাহীন সহযোগিতা করেছে। আর্থিক কষ্ট তেমন ছিলনা। কষ্ট শুরু
           হয়েছিল সামাজিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে। যুব সমাজ ও ছাত্রদের
           সমর্থন কিছুটা পেলেও প্রভাবশালীরা কেউ আমাকে সমর্থন করতোনা।
           ঘরে বাবা অসুস্থ, প্রচন্ড সামাজিক বিরোধিতা আর মনে দ্রোহ। সব
           মিলিয়ে আমার কঠিন অবস্থা। কোন ভাবেই সত্য খবর ছাপা যেতনা।
           ছাপলেই মামলা মোকদ্দমা আর পুলিশের হয়রানী। আপোসের জন্য আমার
           কাছে বারবার প্রস্তাব এসেছে। বয়সের কারণে তখনো চরিত্রটা আপোসী
           হয়ে উঠেনি।
           অল্প সময়ের মধ্যে আমার বিরুদ্ধে অনেকগুলো মামলা রুজু হয়ে গেছে।
           বেশ কিছু মামলায় গ্রেফতারও হয়েছি। দুটি মামলার কথা এখানে উল্লেখ
           করছি। একটি ছিল মহকুমা মেডিকেল অফিসারের, অপরটি ছিল
           মহকুমা হাকিমের পেশকারের। দুটি মামলাতেই গ্রেফতার হয়েছিলাম।
           আমার পক্ষে কথা বলার জন্য স্থানীয় ভাবে আমি কোন উকিল পাইনি।
           মাইজদির প্রখ্যাত উকিল রায়সাহেব নগেন শুরের কাছে আমি ঋণী।
           তিনি ফি না নিয়ে আমার মামলা চালাতে রাজী হয়েছিলেন। বৃদ্ধ
           মানুষটি বাসে চড়ে ফেণী আসতেন আমার মামলা চালাবার জন্য। আজ
           ওই মামলার বাদীদের নাম উল্লেখ করতে চাইনা। তাদের বিরুদ্ধে কোন
           অভিযোগও করতে চাইনা। দুটি মামলাতেই আমি জিতেছিলাম।
           আরও একটি মামলার কথা উল্লেখ করতে চাই। এটি ছিল আদালত
           অবমাননার। তখন পুর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ছিলেন
           বিচারপতি বি এ সিদ্দিকী। এটা হয়েছিল অজ্ঞতার কারণে। আইনের
           সুক্ষ বিষয় ছিল। আমার আইনজীবি ছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ।
           ক্ষমা চেয়ে আমি রেহাই পেয়েছিলাম।
           মহকুমা বা জেলা পর্যায়ে ছোট ছোট অফিসারেরাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন
           ইউনিয়নের চেয়ারম্যানরাও ছিল শক্তিশালী। বেসিক ডেমোক্রেসির
           কারণে তারা খুবই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। এদের কারও দূর্ণীতির
           কথা বলা যেতনা।
           ফেণী পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন আমার এক মামা। তিনি ছিলেন ধনী
           ও প্রভাবশালী। নির্বাচনে তাকে আমি কখনই সমর্থন করিনি। পৌর
           উন্নয়ন কাজের ব্যাপক সমালোচনা ছাপা হতো ফসলে। একবার বাবার
           কাছে নালিশ করেছিলেন। বলেছিলেন অন্য কেউ হলে তিনি টুকরো
           টুকরো করে গাংগে ভাসিয়ে দিতেন। বাবা তখন খুবই অসুস্থ। বললেন,
           আমায় একটু শান্তি দে বাবা। আমি না থাকলে সবাই মিলে তোকে মেরে
           ফেলবে। এখন বিয়ে করেছিস। একটু বুঝে শুনে চল। তুই পরিবারের
           বড় ছেলে। এভাবে চললে পরিবারটা ধংস হয়ে যাবে।
           তবে চলতি সময় হলে সত্যিই আমি মারা পড়ে যেতাম। এখন সমাজপতিরা
           কোন কিছুই সহ্য করতে চায়না।
           বাবা মারা গেলেন ৬৮ সালের ৫ই মার্চ। ৬৯ এর গণ আন্দোলনের সময়টা
           ছিল আমার জন্য বড়ই কঠিন। ১১ দফার পক্ষে আমাকে সারা জেলায়
           সভা ও মিছিল করে বেড়াতে হতো। রাতদিন এ কাজ করেছি মাসের
           পর মাস। চারিদিকে গুজব ছড়িয়ে পড়লো আমার নিরাপত্তা বিষয়ে।
           পরিবার এবং আত্মীয়স্বজন শংকিত হয়ে উঠলো। এমনি এক পরিস্থিতিতে
           ৬৯ শেষের দিকে আমি
           ঢাকা চলে আসি এবং পূর্বদেশের সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার হিসাবে কাজ
           শুরু করি। ৭২ সালে ফসল ঢাকা চলে আসে। সেই থেকে ফসল ও আমি
           ঢাকায় আছি। ফসল এখন দেশের একমাত্র কৃষি দৈনিক। ১৯৭৬ সালে
           শহীদ জিয়াউর রহমান ১০০ কোটি টাকার কৃষি ঋণ চালু করেন এবং
           ব্যাপক প্রচারের জন্য নির্দেশ দেন। তখন দেশের সকল সরকারী ব্যান্ক ও
           পাট দপ্তর ফসল-এর গ্রাহক ছিলো। কৃষি কাগজ হিসাবে ফসল-কে প্রচুর
           বিজ্ঞাপন দেয়ার ব্যবস্থা করেন। জেনারেল এরশাদ এসে ফসল-কে প্রদত্ত
           সব সুবিধা বন্ধ করে দেন। ফসল কৃষি সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এ দেশের
           প্রথম বেসরকারী পত্রিকা।
           মফস্বল শব্দটি বাংলায় এসেছে আরবী থেকে। এখন এটি অক্সফোর্ড
           ডিকশনারীতে পাওয়া যায়। তারা বলছে এটা ইন্দো-ইংলিশ শব্দ।
           এ শব্দের অর্থ গ্রাম নয়। রাজধানী বা কেন্দ্রের সাথে সংযুক্ত আধা শহর।
           জেলা বা মহকুমা শহর। এ ধরনের শহর থেকে যে সব খবরের উত্পত্তি
           তাকে মফস্বল খবর বলা যায়। এখন গ্রামীন খবরও বলা হয়।
           বর্তমানে ইউনিয়ন পর্যায়েও নাকি সংবাদদাতা পাওয়া যায়। সংবাদপত্রের
           বিস্তার গ্রাম পর্যায়ে হলেও সাংবাদিকতার মান অনেক নীচে নেমে গেছে।
            ফেণীতে থাকা কালীন সময়ে আমি কিছুদিন সংবাদ ও দৈনিক পাকিস্তানের
           সংবাদদাতা ছিলাম। যখন ফসল বের করি তখন আমার বয়স ছিল ২৫ বছর।
           এখন ৬৯ বছর চলছে। বুঝতেই পারছেন কত বছর আগের কথা। সমাজ রাস্ট্র
           ব্যবস্থা নিয়ে এখনও মনে দ্রোহ আছে। স্বপ্নের দেশ ও পৃথিবীটাকে দেখে যাবার
           সময় হয়ত আর পাবোনা।
           এখন আমি পুরোপুরি একজন সাহিত্য কর্মী। প্রতিদিন চার ঘন্টা কম্পিউটারে থাকি।
           সরাসরি কম্পিউটারেই লিখতে হয়। হাত কাঁপে বলে সহজে কলম হাতে নিইনা।
           ইতোমধ্যে আমার দশট বই প্রকাশিত হয়েছে। দুটি উপন্যাস আর বাকি গুলো কবিতা।
           হাতে আছে চার পাঁচটি ম্যানাস্ক্রিপ্ট।